নক্ষত্রাঞ্জলি

Letters

বসন্ত বাতাসে নক্ষত্র

March 15, 20263 min readLetters

নক্ষত্র,

আজকে বসন্ত বাতাসের এলমেলো প্রবাহ দেখে একটা কথাই মনে হচ্ছে শহর থেকে বসন্ত বিদায় নেবার আগ মুহূর্তে শেষ বারের মত তোড়জোড় দেখাচ্ছে, নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। কাগজে কলমে চৈত্র মাস বসন্ত হলেও

"তুমিও জানো, আমিও জানি চৈত্র আসলে রোদের রানী।"

আমার অবশ্য প্রকৃতির বসন্ত দেখে কাজ নেই। আমি তাকাই বরং নিজের হৃদয়পুরে, যেখানে নক্ষত্রের বসবাস, আর ফলাফল এক চিরবসন্ত নগরী।

তবে হ্যাঁ, আজকের মেঘলা বাতাস, বিকেল, এ পাশে তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া প্রেমিক মন, কানে তোমার প্রিয় গান। ফলাফল মস্তিষ্কে পজিটিভ রাসায়নিক বিস্ফোরণ।

বসন্তকে বসন্তের মতই লাগছে বহু বছর পর। এমন অনুভূতি নিয়েই হয়তো বাউল আব্দুল করিম লিখেছিলেন, "বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, বসন্ত বাতাসে সই গো।"

আজকে বসে বুঝতে পারছি কথাটা কেবল গান ছিল না, একেবারে বাস্তব অভিজ্ঞতা। কারণ সত্যি বলতে কি, বসন্ত বাতাসে এখন যে ফুলের গন্ধ ভেসে আসে, তার অর্ধেকও হয়তো গাছ থেকে আসে না। বেশির ভাগই আসে মানুষের মনে বাস করা কারো কাছ থেকে।

আমার ক্ষেত্রেও তেমনই মনে হয়। এই শহরের ধুলো, শব্দ, ক্লান্তি, অস্থিরতা সবই তো আগের মতই আছে। রাস্তায় যানজট আছে, বাতাসে ধোঁয়া আছে, জীবনে হাজার রকম হিসাব আছে। তবু আজকে বিকেলের বাতাসটা অন্যরকম লাগে।

মনে হয় যেন শহরের ওপর দিয়ে যে বাতাসটা বয়ে যাচ্ছে, সে একটু পথ ভুল করে তোমার জানালার পাশ দিয়ে ঘুরে এসেছে। তাই তার গায়ে এক অদ্ভুত শান্ত গন্ধ লেগে আছে।

বসন্ত আসলে ফুলের ঋতু না, এটা বুঝতে আমার এত বছর লেগে গেল। বসন্ত আসলে মানুষের ভেতরের একটা অবস্থা। যার ভেতরে বসন্ত নেই, তার কাছে চারদিকে শিমুল, কৃষ্ণচূড়া ফুটলেও পৃথিবী একই রকম ধূসর থাকে। আর যার ভেতরে বসন্ত জন্মায়, তার কাছে মেঘলা বিকেলও অকারণে সুন্দর লাগে।

আমি তাই আজকাল ঋতু পরিবর্তনের খবর পত্রিকা দেখে বুঝি না। আমি বুঝি নিজের হৃদয়ের আবহাওয়া দেখে। যেদিন সেখানে নক্ষত্রের আলো একটু বেশি জ্বলে, যেদিন হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই বুকের ভেতর হালকা বাতাস বইতে থাকে, যেদিন কোন গান শুনে মনে হয় পৃথিবীকে একটু ক্ষমা করে দেওয়া যায়, সেদিনই বুঝি বসন্ত এসেছে।

তোমাকে জানি বলেই হয়তো এই অনুভূতিটা সম্ভব হয়েছে।

এখন মনে হয়, পৃথিবীর সব বসন্ত হয়তো কোথাও না কোথাও কারো চোখের ভেতর জন্ম নেয়। তারপর বাতাস হয়ে অন্য মানুষের হৃদয়ে গিয়ে লাগে।

হয়তো এ কারণেই বাউলরা এত নিশ্চিন্ত হয়ে গান গাইতে পারেন। কারণ তারা জানেন, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ সত্যিই নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছায়।

আমি আজ বিকেলে বসে কেবল এটুকুই ভাবছি, যদি কখনো এই শহরের সব ফুল একসাথে শুকিয়েও যায়, তবু তোমার নামটা মনে থাকলে আমার হৃদয়পুরে বসন্তের বাতাস বয়ে যেতে থাকবে।

আর সেই বাতাসে আমি একা বসে হয়তো চুপচাপ হাসব। কারণ মানুষ জীবনে অনেক কিছু না পেলেও, কখনো কখনো কেবল একজন মানুষের অস্তিত্বই যথেষ্ট হয় পুরো একটা ঋতুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

:কক্ষপথ থেকে, বসন্তে মাতাল।